Nouman Ali Khan Collection In Bangla
দু:খ-যন্ত্রণা বা ডিপ্রেশন কাটিয়ে ওঠার পাঁচটি উপায়
(সম্পূর্ণ খুতবার অনুবাদ)
প্রিয় মুসলিম, আল্লাহ যেভাবে আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তাতে আমরা নিছক অনুভূতিহীন কোনো সত্তা নই। বরং আমরা সংবেদনশীল সৃষ্টি- যারা চিন্তা করতে পারে, আবার অনুভবও করতে পারে। আমাদের মাঝে থাকা এই অনুভূতিগুলো, এগুলোই আমাদেরকে অন্য আরও অনেক সৃষ্টির তুলণায় আলাদা করে তোলে। আমরা ভয় পাই, আমরা আশা করি, আমরা উদ্বিগ্ন হই, আমরা হতাশ হই, আমরা দুশ্চিন্তা করি।
প্রকৃতপক্ষে, এই চিত্তাবেগগুলোর সমন্বয়েই আমাদের মানবিক সত্তা গঠিত হয়।
আর ইনশা আল্লাহ, আজকে আমি এই আবেগগুলোর কয়েকটি নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই। উদ্বেগ এবং মানসিক চাপের প্রবল আবেগ। শোক এবং দুশ্চিন্তার মতো আবেগ। এই আবেগগুলো একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এগুলো যদি অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় থাকে, যদি আমরা এগুলোকে বিবেচনায় না নেই, তাহলে এটা সম্ভব যে - এই আবেগগুলো আমাদের গ্রাস করে ফেলতে পারে। এটা সম্ভব যে এই আবেগগুলো আমাদেরকে অন্ধকার এবং বিপথগামী পথে ঠেলে দিতে পারে। তাই ইনশা আল্লাহ, আজকে আমরা এই মানবীয় আবেগগুলোর বাস্তবতা সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই। এমন সব আবেগ; যদি আমরা এগুলোকে নিয়ন্ত্রণে না রাখি, তবে তা মানসিক অস্থিরতা, বিষণ্ণতা বা এর চেয়েও ভয়াবহ কোনো পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
হে মুসলিম, জেনে রাখুন, কুরআন মানবীয় আবেগ এবং মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির ঘটনায় ভরপুর। কুরআন কথা বলেছে সবচেয়ে সৎকর্মশীলদের বিষয়ে, মানবজাতির সবচেয়ে ধার্মিক ব্যক্তিদের সম্পর্কে, যারা দুশ্চিন্তা ও চাপ অনুভব করেছেন, দুর্দশা ও ব্যথা অনুভব করেছেন। আল্লাহ কুরআনে মুসা (আ)-এর মায়ের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছেন, [وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَىٰ فَارِغًا] - (ওয়া আছবাহা ফুয়াদু উম্মি মুসা ফারিগা)। যখন তিনি মুসাকে নীল নদে ভাসিয়ে দিলেন, আপনি কি জানেন তাঁর মনে কী অনুভূতি তৈরি হয়েছিল? আল্লাহ বলেছেন, তাঁর হৃদয় শূন্য হয়ে গিয়েছিল। তিনি ভাবতে পারছিলেন না। তিনি প্রবল আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর অন্তর হয়ে গিয়েছিল — [فَارِغْ] - (ফারেগ)।
আল্লাহ নবী ইয়াকুব (আ)-এর ব্যাপারেও কথা বলেছেন। [وَابْيَضَّتْ عَيْنَاهُ مِنَ الْحُزْنِ فَهُوَ كَظِيمٌ] - (ওয়াবইয়াদ্দত ‘আইনাহু মিনাল হুযনি ওয়াহুয়া কাযীম)। তিনি এত বেশি কেঁদেছিলেন যে, তাঁর চোখ অন্ধ হয়ে যায় এবং তিনি শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। তীব্র শোকে, নবী ইয়াকুব এত বেশি কষ্ট অনুভব করেছিলেন যে, এটি তাঁর চোখের ওপর বিরাট প্রভাব ফেলেছিল। মহান আল্লাহ আইয়ুব (আ)-এর কথাও উল্লেখ করেছেন যিনি অসংখ্য বিপদে আক্রান্ত হয়েছিলেন, আর তিনি এ বলে আল্লাহকে ডেকেছিলেন, ইয়া রব, আমি কষ্টে আছি। [أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ] - (আন্নী মাসসানিয়াদ-দুররু) - ইয়া রব, আমি কষ্টে পতিত হয়েছি।
মহান আল্লাহ এই পৃথিবীর বুকে হেঁটে চলা সবচেয়ে নেককার নারীর কথা উল্লেখ করেছেন, আর পবিত্র কুরআনে নাম ধরে উল্লেখ করা তিনিই একমাত্র নারী — মারিয়াম সালামুন আলাইহা। তিনি পরিবার ছাড়া, নিঃসঙ্গ অবস্থায়, সম্পূর্ণ একা, দূরের এক স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তিনি ছিলেন গর্ভবতী। তিনি ঈসা অর্থাৎ যিশু খ্রিস্টকে পৃথিবীতে জন্ম দিতে চলেছেন। তাঁর সাথে কেউ নেই। সেই অবস্থায় শারীরিক যন্ত্রণা, মানসিক কষ্ট, তীব্র বেদনা আর মানসিক চাপে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন হয়ে তিনি কী বললেন?
তিনি এমন কিছু বললেন, যা কোনো সাধারণ মানুষকে যদি জিজ্ঞাসা করা হতো, সে হয়তো চোখ বড় করে বলতো, "ও, এটা কুফর, এটা হারাম, এটা শিরক"। কথাটা কে বলেছিলেন? মারিয়াম সালামুন আলাইহা। তিনি কী বলেছিলেন? [قَالَتْ يَا لَيْتَنِي مِتُّ قَبْلَ هَٰذَا وَكُنتُ نَسْيًا مَّنسِيًّا] - (ক্বলাত ইয়া লাইতানি মিত্তু ক্ববলা হাযা ওকুনতা নাসইয়াম মানসিয়্যা) - হায়! যদি আমি এই দিন দেখার আগেই মারা যেতাম! তিনি আক্ষরিকভাবেই নিজের অস্তিত্ব বিলোপের আকুতি জানাচ্ছেন।
অসহ্য যন্ত্রণায় এমন ইচ্ছা মনে জাগাটা দোষের কিছু নয়; এটিকে বাস্তবে রূপ দান করাই হলো পাপ। তিনি জীবিত না থাকার আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন। [قَالَتْ يَا لَيْتَنِي مِتُّ قَبْلَ هَٰذَا وَكُنتُ نَسْيًا مَّنسِيًّا] - (ক্বলাত ইয়া লাইতানি মিত্তু ক্ববলা হাযা ওকুনতা নাসইয়াম মানসিয়্যা) - আমি যদি মানুষের স্মৃতি থেকে পুরোপুরি মুছে যেতাম! কেউ আমার কথা জানতো না! আমি অস্তিত্বহীন হয়ে যেতাম! তাঁর কষ্ট, তাঁর যন্ত্রণা, তাঁর ট্র্যাজেডি, তাঁর এই একাকিত্বের অনুভূতি—এটাই তাঁকে এই ধরনের মানসিক অবস্থা পোষণ করতে বাধ্য করেছিল। তারপর আল্লাহ তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন এবং শান্ত করেছিলেন।
যখন আপনি কুরআন পড়বেন, সেক্ষেত্রে বাস্তবিক অর্থেই এই দাবিটি সম্পূর্ণ সঠিক যে, নেককারদের বিষয়ে, নবীদের বিষয়ে কিংবা আল্লাহর বাছাইকৃত বান্দাদের বিষয়ে, কোরআনে উল্লেখিত প্রায় প্রতিটি গল্পই তাঁদের হৃদয়ের গহীনের কোনো ট্র্যাজেডি নিয়ে আলোচনা করেছে, তাঁদের অন্তরে বিদ্যমান কোনো যন্ত্রণার কথা বলেছে। মানুষ হিসেবে এটাই আমাদের বাস্তবতা। আর সেই কারণেই, এই ধরনের যন্ত্রণা, চাপ আর বেদনা ভোগ করতে হয়। কুরআন আমাদেরকে শিক্ষা দেয় যে, এটি সমগ্র মানবজাতির জীবনেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর উৎস হয়তো ভিন্ন হতে পারে। পরিবার সব সময়ই মানসিক চাপের একটি বড় উৎস। ইয়াকুব, ইউসুফ, ইউসুফের ভাইয়েরা — এটা ছিলো পারিবারিক সমস্যা। পরিবার এতটাই বেশি মানসিক চাপ সৃষ্টি করে! আর্থিক বিষয়াবলি সম্পর্কিত ট্র্যাজেডি, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যা। আইয়ুবের স্বাস্থ্যগত সমস্যা ছিল, পাশাপাশি ছিল সামাজিক নানা সমস্যা।
নূহ (আ), লূত (আ)। কষ্টের কারণগুলো হয়তো ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু এই গোটা পৃথিবীটাই দুঃখ-কষ্টের নানা উপাদানে পরিপূর্ণ।
আর তাই, কুরআন আমাদের শিক্ষা দেয় যে, এমন কিছু বিষয় রয়েছে- যা আমাদের পর্যবেক্ষণ করা উচিত, নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। ও মুসলিম, আমাদের দেহের ক্ষেত্রে, দেহকে আমরা প্রশিক্ষণ দিতে পারি, সুস্থ রাখতে পারি, খাদ্যাভ্যাসকে পর্যবেক্ষন করতে পারি, ব্যায়াম করতে পারি এবং সর্বোপরি ইনশাআল্লাহ আমরা ভালো একটি শারীরিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে পারি। মাঝে মাঝে আমাদেরকে ডাক্তারের কাছেও যেতে হয়।
আধ্যাত্মিকতার বিষয়টিও একই রকম; আমাদের উচিৎ একে প্রশিক্ষণ দেয়া, আল্লাহর সাথে সংযুক্ত রাখা এবং যিকির ও ইবাদাত বৃদ্ধি করা। আর মাঝে মাঝে বিভিন্ন বিষয় এবং আধ্যাত্মিক পরামর্শের জন্য আমাদেরকে একজন ‘আলেম-এর শরণাপন্ন হতে হয়। মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও তাই। দুশ্চিন্তা এবং মানসিক চাপের ক্ষেত্রেও এটা প্রজোয্য। সাধারণত, বেশিরভাগ সময়ই আমরা এই ধরণের সমস্যাগুলো নিজেদের চেষ্টায় সামলাতে সক্ষম, যদি আল্লাহর দেয়া নির্দেশিকাগুলো মেনে চলি। তবে কখনো কখনো সেটা সম্ভবপর হয় না। তখন আমরা প্রোফেশনাল কারো সহায়তাও নিতে পারি, এতে সমস্যার কিছু নেই।
তো, কুরআন আমাদের জন্য কোন ধরনের নির্দেশিকা নিয়ে এসেছে? মানসিক চাপ এবং দুশ্চিন্তার অভ্যন্তরীণ কারণগুলো মোকাবিলা করার জন্য আমাদের ধর্ম আসলে কী কী বাস্তব সমাধান নিয়ে এসেছে? অভ্যন্তরীণ এই কারণগুলো মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে, একটি অত্যন্ত বিখ্যাত উক্তি রয়েছে, কেউ কেউ বলে এটি একটি হাদিস, তবে এটি আসলে অতীত কালের চিন্তাবিদগণের একটি উক্তি। উক্তিটি হলো--প্রকৃত জিহাদ হলো অভ্যন্তরীণ জিহাদ। সত্যিকারের জিহাদ হলো আত্মার জিহাদ, ক্বলবের জিহাদ। অর্থাৎ, বাইরের সংগ্রামের চেয়ে ভেতরের এই সংগ্রামটি হলো অনেক বড় সংগ্রাম। এটি একটি ইসলামী মূলনীতি। নিজের ভয় এবং সন্দেহকে জয় করার জন্য অভ্যন্তরীন এই সংগ্রাম, নিজের ভেতরের অশুভ প্রবৃত্তিগুলোকে জয় করার সংগ্রাম, সেটাই অনেক বেশি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ লড়াই। এটিই হলো প্রকৃত লড়াই। বাইরের লড়াইগুলো অনেক সহজ, যদি আপনি ভেতরের লড়াইগুলো সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে পারেন।
তাই ইনশা আল্লাহ, আজ আমি আপনাদেরকে পাঁচটি উপদেশ প্রদান করব। অবশ্যই আরও অনেক কিছু বলা সম্ভব, কিন্তু আমাদের সময় সীমিত। পাঁচটি প্রজ্ঞা — যেগুলো কুরআন থেকে নেয়া, অতীতের বিভিন্ন ঘটনাবলি নেয়া এবং রসূল (স)-এর সীরাত থেকে শিক্ষা নিয়ে কীভাবে আমরা মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা এবং হতাশার মোকাবিলা করতে পারি, যা মানুষ হিসেবে আমাদের বেঁচে থাকার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রধান বিষয় হলো, সর্বপ্রথম এবং প্রধানত, এই স্বীকৃতি দেওয়া যে - চিন্তিত হওয়া, কোনো সমস্যার কারণে নির্ঘুম রাত কাটানো; স্বাস্থ্য, পরিবার, অর্থ-সম্পদ, সমাজ কিংবা অফিস পলিটিক্সের কারণে নিজের হৃদয়ে ব্যথা অনুভব করা, এই সবই মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর যত ধার্মিকই হোন না কেন, আপনি মানসিক চাপ অনুভব করবেন। এমনকি আল্লাহর রসূলের ক্ষেত্রেও এটি প্রজোয্য, আল্লাহ কুরআনে আমাদের রসূল মুহাম্মাদ (স) সম্পর্কে বলেছেন, [وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّكَ يَضِيقُ صَدْرُكَ بِمَا يَقُولُونَ] - (ওয়ালাক্বদ না’লামু আন্নাকা ইয়াদীক্বু ছদরুকা বিমা ইয়াক্বুলুন) - আমি জানি ইয়া রাসুলাল্লাহ, তারা আপনার সম্পর্কে যা বলে তার কারণে আপনার হৃদয় যন্ত্রণায় কাতর। সামাজিক চাপ, ‘কিইলা ওয়া ক্বাল’ কুধারণা, গুজব, নেতিবাচক রটনার কারণে রসূল (স) হৃদয়ের যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। স্বয়ং আল্লাহ কুরআনে এই কথা বলেছেন, “এই সমাজের চাপের কারণে আপনার হৃদয় ব্যথা অনুভব করছে”। এটি আমাদের কী প্রদর্শন করে?
এক নাম্বার পয়েন্ট — আপনার কষ্টটা বাস্তব। কেউ যেন আপনার সেই যন্ত্রণা, দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য না করে। মুসলিম হিসেবে এটি আপনাকে ছোট করে না, বরং আপনার মানবিক দিকটিকে সত্যায়িত করে।
সবচেয়ে শক্তিশালী একজন মুসলিম, সবচেয়ে মহান একজন মুমিনও এই দুনিয়ার বুকে নানা কষ্ট ভোগ করবেন। ভেতরের সেই কষ্ট অনুভব করা, মানসিক চাপ অনুভব করা হলো বেঁচে থাকার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আপনার ঈমানের স্তর যেমনই হোক না কেন, আপনি দুশ্চিন্তায় পড়বেন। কিছু বিষয় আপনাকে মানসিক চাপে ফেলবেই।
আবু বকর আস-সিদ্দিক; তিনি কে ছিলেন? আস-সিদ্দিক। তবুও, সাওর পর্বতে, তিনি দুশ্চিন্তায় পড়ে যান, কাঁপতে থাকেন। রসূল (স) তখন বলেছিলেন, [إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ] - (ইয ইয়াক্বুলু লিছহিবিহি লা তাহযান) - দুশ্চিন্তা করো না। আবু বকর চিন্তিত ছিলেন। তিনি ছিলেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। চিন্তিত হওয়াটা স্বাভাবিক বিষয়। মানসিক চাপে থাকাও স্বাভাবিক বিষয়। সত্যি বলতে, গুহার বাইরে কুরাইশদের উপস্থিতি টের পাওয়া সত্ত্বেও আপনি যদি দুশ্চিন্তা এবং মানসিক চাপে না ভোগেন, তাহলে আপনার মাঝে সমস্যা আছে।
দুনিয়ার কিছু বিষয় নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়াটা স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। সেই মানসিক চাপকে আপনার নিজের ঈমান এবং মানবিকতাকে সন্দেহে ফেলার সুযোগ দেবেন না। আপনি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। দিশেহারা বোধ করাটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। এটি ইসলামসম্মত। এটি কুরআনসম্মত। এটি নবীজির সীরাতের একটি অংশ যে, এই দুনিয়ার বিভিন্ন ধরনের সমস্যা আপনার মন এবং ক্বালবের মাঝে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি করবে। এটি মোটেও ঈমানের কোনো দুর্বলতা নয়। আপনার ঈমানে কোনো সমস্যা নেই।
তাই এক নাম্বার পয়েন্ট হলো, বিষণ্ণতাকে স্বীকৃতি দেওয়া। স্বীকৃতি। কারণ আপনি যখন এই বিষণ্ণতাকে অবজ্ঞা করেন, যখন বলেন এটি বাস্তব নয়, যখন একে তুচ্ছ করেন, বাস্তবিক অর্থে আপনি সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছেন। আর এটি মোটেও কুরআনসম্মত পদ্ধতি না। আপনার কী মনে হয়? কেন মহান আল্লাহ কোরআনে উল্লেখ করেছেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি জানি এটা খুব কঠিন”? কেন? কেন তিনি নবীজীর সেই যন্ত্রণাকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন? এটি হলো মানসিক যন্ত্রণা লাঘবের উপায়গুলোর মধ্যে একটি। একে অবজ্ঞা করবেন না।
মানুষের কষ্ট এবং সহনশীলতার মাত্রা আলাদা হয়। যা আপনাকে প্রভাবিত করে, তা হয়তো আপনার ভাইকে প্রভাবিত করবে না। যা আপনার ভাইকে ভাবায়, তা হয়তো আপনার চাচাতো ভাইকে ভাবাবে না। কিন্তু আমরা সকলেই যন্ত্রণা অনুভব করি। আর দর্শকদের মাঝে থাকা তরুণদের বলছি, যারা টিকটকে বিশ্বাস করো, সোশ্যাল মিডিয়া ও ইনস্টাগ্রামে বিশ্বাস করো; আমি তোমাদের নিশ্চিত করে বলছি, যদি এমন কাউকে দেখো, যাকে ছবির মধ্যে সবসময় সুখী মনে হয়, যদি কোনো জুটিকে একসাথে দেখো, মনে হয় যেন তারাই সবচেয়ে সেরা জুটি, যদি অনলাইনে কোনো কাল্পনিক দুনিয়া দেখো, যেহেতু তুমি এখনো তরুণ এবং যদি ভাবো সেটাই সত্য, তাহলে আমি সেই ভুল ভেঙে দিচ্ছি এবং একটি রূঢ় বাস্তবতার কথা তোমাকে বলছি —
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই তার ভেতরের কোনো না কোনো সমস্যার সাথে লড়ছে। কারো জীবনই নিখুঁত নয়। কারো না। একজন মানুষের জীবনও না। আপনি এখানে বসে আছেন, আপনার ডানে থাকা মানুষটি, বামে থাকা মানুষটি, সারা বিশ্বের প্রতিটি মানুষ, সকলেই কোনো না কোনো সমস্যায় ভুগছে। কারণ মানুষ হওয়ার অর্থ আসলে এটাই। মানসিক চাপ, বেদনা, দুশ্চিন্তা, হতাশা, অশান্তি, অজানা বিষয়ের ভয়, অতীতের অপরাধবোধ, ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা — মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। তাই সেই আবেগকে স্বীকৃতি দিন। কোরআন, সুন্নাহ, এবং সীরাত কখনোই সেই আবেগকে ছোট করে দেখে না।
দুই নাম্বার পয়েন্ট হলো, যখন আপনি বুঝতে পারবেন যে আমরা সবাই বিভিন্ন ধরনের মানসিক চাপে ভুগছি, তখন এর ধর্মীয় প্রজ্ঞাটি উপলব্ধি করুন। “কেউই তো এর থেকে মুক্ত নয়; তাহলে এমনটি কেন হচ্ছে”? কেন এমন হচ্ছে তা বুঝতে পারাটা—আমাদের আত্মার জন্য পরম স্বস্তিদায়ক। উপলব্ধি করুন যে আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে পরীক্ষা করছেন। কিছু পরীক্ষা অন্যগুলোর তুলণায় সহজ। [وَنَبْلُوكُم بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ] - (ওয়ানাবলুকুম বিশ-শাররি ওয়াল খাইরি) - আমি তোমাদেরকে ভালো দ্বারা পরীক্ষা করব, আমি তোমাদেরকে মন্দ দ্বারাও পরীক্ষা করব। সুতরাং ভালো থাকাও একটি পরীক্ষা।
সুস্বাস্থ্য, সম্পদের আধিক্য, অবসর সময়, ভালোবাসাপূর্ণ পরিবার — এগুলোও এক ধরনের পরীক্ষা। আপনি পরীক্ষায় পাশ করছেন কি না, সময়ের সঠিক ব্যবহার করছেন কি না, যা করা উচিত তা করছেন কি না — এগুলো সবই ইতিবাচক পরীক্ষা। এতে উত্তীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করুন। একইসাথে নেতিবাচক কিছু পরীক্ষাও রয়েছে। কষ্ট, ট্র্যাজেডি, প্রিয়জন হারানোর বেদনা, ব্যক্তিগত নানাবিধ সমস্যা, দেউলিয়া হয়ে যাওয়া, আর্থিক সংকট, সামাজিক চাপ, সারা বিশ্বে যা কিছু ঘটছে, তা ফিলিস্তিনই হোক বা অন্য কোথাও। এগুলো এমন পরীক্ষা যা আমাদের যাচাই করছে। [وَنَبْلُوكُم] - (ওয়ানাবলুকুম)। আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা করছেন।
প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ কোরআনে স্পষ্টভাবে বলেছেন, [لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي كَبَدٍ] - (লাক্বদ খালাক্বনাল ইনসানা ফী কাবাদ) - আমি মানুষকে কষ্টের মাঝেই সৃষ্টি করেছি। এটাই হলো এই পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়ম। এটা চিরস্থায়ী শান্তির আবাসস্থল নয়। এটা পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার স্থান। এটা হলো ইমতিহানের স্থান, এটা ইখতিবার এবং ইবতিলার স্থান। আসলে, আমাদের ভেতরের এই বিচিত্র আবেগগুলোই আমাদেরকে পরীক্ষা করার বড় একটি মাধ্যম। সুতরাং উপলব্ধি করুন, মহান আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা করছেন এবং এরপর ইসলামী উপায়ে এর জন্য সান্ত্বনা খুঁজে নিন।
সেই ইসলামিক উপায়টি আসলে কী? আমাদের কাউকেই এমন কোনো কঠিন পরীক্ষায় ফেলা হয় না, যে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া আমাদের সাধ্যের বাইরে। আমাদের সবাইকে ঠিক সেই মাত্রা ও সীমা পর্যন্তই পরীক্ষা করা হয়, যা আমরা অতিক্রম করতে পারব। [لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا] - (লা ইউকাল্লিফু-ল্লাহু নাফসান ইল্লা উস’আহা)। যে পরীক্ষার মাঝেই থাকুন, এর কোনোটিই আপনাকে ব্যর্থ করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়নি। আপনি পারবেন, সক্ষম হবেন, উত্তীর্ণ হবেন, যদি আল্লাহর দিকে ফিরে আসেন।
প্রিয় ভাই, প্রিয় বোন, যে মুহূর্তে আপনি ভাববেন, “ওহ, আমার পরীক্ষাটা কঠিন, আর অন্য কারও পরীক্ষা সহজ”, আমি কসম করে বলছি, যদি কাল্পনিক উপায়ে আপনি সেই ব্যক্তির সাথে শরীর বদল করতে পারতেন- যদি কাল্পনিক উপায়ে সেই ব্যক্তির মনের সাথে নিজের মন বদল করতে পারতেন, এবং এরপর মাত্র ১০ মিনিটের জন্য আপনি বুঝতে পারতেন যে সে কী কী পরীক্ষায় রয়েছে, আল্লাহর শপথ, আমাদের প্রত্যেকেই তখন বলত, তার পরীক্ষার চেয়ে আমার নিজের পরীক্ষাটাই আমি অনেক ভালোভাবে সামলাতে পারব। তার পরীক্ষার চেয়ে আমার নিজের পরীক্ষাই আমি ভালো বুঝি। তার জীবনের চেয়ে আমার নিজের জীবন কীভাবে কাটাতে হবে, তা আমি ভালো জানি।
এটি কেন? কারণ আল্লাহ আপনার জন্যই আপনার পরীক্ষাটি সাজিয়েছেন। আল্লাহ আপনাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি শুধু আপনার জন্যই একটি পরীক্ষা তৈরি করেছেন। আপনার আগে বা পরে মানব ইতিহাসের কেউই আপনার মতো হুবহু একই পরীক্ষা পাবে না। শুধু আপনাকেই আপনার পরীক্ষার উত্তর দিতে হবে। অন্য কারো পরীক্ষা আপনার মতো নয়। কেন? কারণ আল্লাহ আপনাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি জানেন কোন পরীক্ষাটি আপনার জন্য উত্তম। তিনি জানেন, কোন পরীক্ষাটিতে আপনি সর্বোচ্চ নাম্বার পেতে পারবেন, হয়তো তা কিছুটা কঠিন হতে পারে। আমি বলছি না এটি সহজ, কিন্তু মহান আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করলে কোনো পরীক্ষাতেই আপনি অকৃতকার্য হবেন না।
তাই গভীরভাবে উপলব্ধি করুন, কেন পরীক্ষাটি নেয়া হচ্ছে। আর ধর্মের ভূমিকাটি হলো, এটি পরীক্ষাকে দূর করে দেয় না। পরীক্ষা কখনো নিঃশেষ হয়ে যাবে না। বরং, এটি পরীক্ষায় পাশ করার উপযোগী করে হৃদয়কে গড়ে তোলে। ধর্ম যা করে, এটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বীরত্ব, সাহস এবং ঈমান প্রদান করে। পরীক্ষা কখনোই নিঃশেষ হয়ে যাবে না। রসূল (স) তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় জুড়েই পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন। ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত তাঁর হৃদয়ে যন্ত্রণা থেকেই গিয়েছিল। তাঁর জীবনে অনেক ট্র্যাজেডি ঘটেছিল। কষ্ট সম্পূর্ণ দূর হয়ে যাবে এমনটা ঘটবে না।
ইসলাম যা করে, ঈমান যা করে, তা আপনাকে কষ্টের মাঝে টিকে থাকতে সাহায্য করে। কষ্ট সত্ত্বেও, বেঁচে থাকাকে সহজ করে। ইসলাম এবং ইমান ঠিক এই ভূমিকাটিই পালন করে থাকে।
তিন নাম্বার পয়েন্ট হলো, কোরআন আমাদের শেখায় যে, কিছু মানসিক চাপ, সবগুলো নয়, কিছু কষ্ট যার মধ্য দিয়ে আপনি যাচ্ছেন, আপনি চাইলে তা সমাধান এবং দূর করতে পারবেন। তাই কষ্ট কমানোর দিকে মনোযোগ দিন। আমি এবং আপনি যেই দুর্দশারই মুখোমুখি হই, এর এমন কিছু দিক আছে যা আমরা দূর করতে, অপসারন করতে, হ্রাস করতে পারি, এমনকি হয়তো তা সম্পূর্ণরূপে দূর করতেও পারি। আবার এর এমন কিছু দিকও আছে যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাহলে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত যন্ত্রণাকে হ্রাস করা, এবং ভেতরের কষ্ট ও যন্ত্রণাকে কাটিয়ে ওঠা। তাই, কোরআন আমাদের শেখায়, ভাগ্যনির্ভর হয়ে বসে থাকবেন না এবং হাল ছেড়ে দেবেন না। না; আপনার প্রতিটি দুর্দশার ক্ষেত্রেই এমন কিছু ব্যবহারিক পদক্ষেপ রয়েছে যা দিয়ে সংকটটি সম্পূর্ণরূপে কাটিয়ে উঠতে না পারলেও অন্তত তা কমাতে পারবেন।
যদি আর্থিক চাপ ও সমস্যায় থাকেন, তবে বিসমিল্লাহ বলে একটি সিভি (CV) তৈরী করুন এবং দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করুন। কাজ খুঁজতে শুরু করুন, কিছু একটা করুন। আপনার দাম্পত্য সমস্যা থাকলে, হাল ছেড়ে দেবেন না। সম্পর্কটি পুণরুদ্ধারের চেষ্টা করুন। সমস্যার কারণটি খুঁজে বের করুন। প্রয়োজন হলে, মধ্যস্ততা করার চেষ্টা করুন। সন্তানরা যদি বিপথে চলে যায়, তবে অন্য বাবা-মায়েদের জিজ্ঞেস করুন, “এখন আমার করণীয় কী”? কিছু করার চেষ্টা করুন। হাল ছাড়বেন না। কারণ যখন আপনি চেষ্টা করবেন, ঠিক তখনই আল্লাহ আপনার সেই চেষ্টায় বারাকাহ দান করবেন। মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ কমান। এবং অবশ্যই, সব ধরনের উদ্বেগ হ্রাস করার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়গুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো, সেই হাতিয়ারগুলো যা ধর্ম আমাদের দেয়। আর এটি আমাদেরকে নিয়ে যায় চার নাম্বার পয়েন্টে।
চার নাম্বার পয়েন্টটি হলো, যদি আপনি বাইরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, তবে বাইরের পরিস্থিতির প্রতি আপনার ভেতরের প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। যদি বাইরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, আপনি কিন্তু আপনার ভেতরের জগতের নিয়ন্ত্রক।
তাই, যতটা সম্ভব অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করুন। আর কীভাবে তা করবেন? ঠিক এখানেই ঈমান, তাকওয়া এবং ধর্ম একটি বড় ভূমিকা পালন করে। মানসিক চাপ মোকাবিলা করার, উদ্বেগ মোকাবিলা করার, শোক, ট্র্যাজেডি, হাম (هَمْ) এবং হুযন (حُزْن) মোকাবিলা করার অন্যতম কার্যকর উপায় হলো, বিশ্বাসের থেরাপির মাধ্যমে, ঈমানের থেরাপির মাধ্যমে, তাকওয়ার থেরাপির মাধ্যমে, এবং একান্তভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দিকে ফিরে আসার থেরাপির মাধ্যমে এর মোকাবিলা করা।
আর এর পরেই রয়েছে, পরিবার-পরিজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের গভীর ভালোবাসার থেরাপি। আমি একে বলি — থ্রি এফ (3F) । ফেইথ, ফ্যামিলি এন্ড ফ্রেন্ডস। এই তিনটি এফ মুখস্থ করুন। এবং জেনে রাখুন, এগুলো অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণাকে দূর করার বা তা কমিয়ে আনার অন্যতম কার্যকর উপায়।
ঈমান থেকে কখনোই বিচ্ছিন্ন হবেন না। মানসিক সুস্থতার জন্য এটিই আপনার চূড়ান্ত সংযোগ সূত্র। পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুদের ভালোবাসাপূর্ণ সহায়তাকে কখনোই তুচ্ছ করবেন না। সীরাতও আমাদেরকে এই বিষয়টিই শিক্ষা দেয়। যেমন, রসূল (স) আবু বকর আস-সিদ্দিকের প্রশংসা করেছিলেন, উমরের প্রশংসা করেছিলেন, উসমানের প্রশংসা করেছিলেন, তাঁদের নির্দিষ্ট অবদানের জন্য। কারণ আপনার আশে-পাশে মানুষের প্রয়োজন আছে।
যদি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন, গুটিয়ে ফেলেন, মসজিদে না আসেন, দরজা বন্ধ রাখেন, তবে সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে তুলছেন। সমস্যাটিকে আরও খারাপ করে তুলছেন। তাই, কোরআন আমাদের শেখায়, সুন্নাহ আমাদের শেখায় যে, আপনার নিজের ভেতরে প্রশান্তি খুঁজে পেতে সক্রিয়ভাবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন, বাইরের বিশৃঙ্খলা থাকা সত্ত্বেও। বাইরের বিশৃঙ্খলা হয়তো অদৃশ্য হয়ে যাবে না, কিন্তু আপনি এর সাথে মানিয়ে নিতে শিখবেন। অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণা কাটিয়ে ওঠার নিমিত্তে একটি নতুন বাস্তবতা এবং নতুন যাত্রা শুরু করবেন।
আর যদি পেশাদার কারো সহায়তার প্রয়োজন হয়, সমস্যার কিছু নেই। আমরা এখন এমন একটি বাস্তবতায় এসে উপনীত হয়েছি যা দীর্ঘ সময় ধরে নিষিদ্ধ ছিল। একসময় পেশাদারদের সহায়তা নেয়াকে অনৈতিক অথবা আমাদের মর্যাদাবোধের জন্য হানীকর বলে বিবেচনা করা হতো। না। দৈহিক রোগের ক্ষেত্রে — হ্যাঁ, আমাদের অনেক রোগই প্রাকৃতিকভাবে সেরে ওঠে। কিন্তু মাঝে মাঝে আমাদের ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রেও — হ্যাঁ, স্বাভাবিক নিয়ম হলো আপনি সরাসরি আল্লাহর ইবাদত করবেন। মাঝে মাঝে একজন ‘আলিমের কাছে গিয়ে কিছু সন্দেহ দূর করার, সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
সাধারণত, স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, ইনশা আল্লাহ, ছোট মানসিক সমস্যাগুলো আপনি নিজেই সামলাতে পারেন। কিন্তু যদি দেখেন যে মনে অন্ধকার এবং হতাশাজনক চিন্তাভাবনা আসছে, যদি দেখেন যে আমার উল্লেখিত কৌশলগুলো কাজ করছে না, তখন পেশাদার কারো সহায়তা নিতে কোনো লজ্জা থাকা উচিত নয় এবং এতে দোষেরও কিছু নেই। এজন্যই তো থেরাপিস্টরা নিয়োজিত আছেন, এবং সাইকিয়াট্রিস্টরা নিয়োজিত আছেন। আমাদের এখন এই উপলব্ধি এসেছে যে, কখনো কখনো দেহের জন্য যেমন একজন ডাক্তারের প্রয়োজন হয়, ঠিক তেমনি কখনো কখনো মানসিক অসুস্থতায় সহায়তা করার জন্যেও একজন বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হতে পারে। আপনিই সবচেয়ে ভালো বুঝবেন এবং আপনার পরিবারও এই বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে।
চার নাম্বার পয়েন্টের ক্ষেত্রে উপলব্ধি করুন যে, যদি বাইরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। [إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ] - (ইন্নাল্লাহা লা ইউগাইয়্যিরু মা বিক্বওমিন হাত্তা ইউগইয়্যিরু মা বি-আনফুসিহিম)। আল্লাহ আপনার বাইরের অবস্থা পরিবর্তন করবেন না যতক্ষণ না ভেতরটা পরিবর্তন করবেন।
আল্লাহ বাইরের অবস্থা পরিবর্তন করবেন না যতক্ষণ না ভেতরটা পরিবর্তন করবেন। ভালো কিছুর জন্য নিজের ভেতরটাকে বদলান।
আল্লাহর দিকে ফিরুন। রিদা [رِضَا] বা সন্তুষ্ট থাকার উপকারীতাটি উপলব্ধি করুন; তাকদীরে বিশ্বাসের গুরুত্ব বুঝুন, সবকিছুই আল্লাহর হুকুমে ঘটে থাকে; সবরের উপকারীতা বুঝুন, যিকিরের উপকারীতা বুঝুন, যিকিরের মাধ্যমে হৃদয় প্রশান্তি খুঁজে পায়; নামাজের উপকারীতা বুঝুন, নামাজ হলো [قُرَّةُ عَيْنِِ] - (ক্বুররাতু ‘আইনিন) - চোখের পরম প্রশান্তি; দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের উপকারীতা উপলব্ধি করুন। এর সবগুলোই আপনার ভেতরের সেই যন্ত্রণাকে সফলভাবে জয় করতে সাহায্য করবে।
এবং এর পাশাপাশি, ভালোবাসাপূর্ণ পরিবার এবং বন্ধু-বান্ধব খুঁজে নিন। সমাজের একটি অংশে পরিণত হোন। নিজেকে আটকে রাখবেন না। মানুষের দেয়া ভালোবাসা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবেন না। এটিও সীরাত এবং সুন্নতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রসূল (স) অনেক ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছিলেন। যখনই তিনি ট্র্যাজেডির শিকার হতেন, তিনি কখনোই নিজেকে ঘরবন্দি করেননি এবং সমাজের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করেননি। না; এমনকি যখন আমাদের মা খাদিজা ইন্তেকাল করেছিলেন এবং এটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর মধ্যে একটি, তবুও তিনি মানুষের সাথে মিশেছেন, বাইরে গিয়েছেন। তিনি মানুষের সাথেই ছিলেন, কারণ এটি হলো মানসিক কষ্ট কাটিয়ে ওঠার জন্য অত্যাবশ্যকীয় একটি ধাপ।
আজকের সর্বশেষ এবং পঞ্চম পয়েন্টটি, আর তা সবার শেষে আসবে। এটিকে এক নম্বরে রাখা উচিত নয়। কারণ আপনাকে কাজ করতে হবে, সক্রিয় হতে হবে এবং হতাশা হ্রাস করার চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি পাঁচ নাম্বার পয়েন্টটিও থাকবে। তবে, যখন আপনি সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন, হতাশা কমানোর সব ধরণের চেষ্টা করবেন, এটি আসবে তার পর। তো, পাঁচ নাম্বার পয়েন্টটি হলো সেই উপলব্ধি যে, এই পৃথিবীটা আসলে চূড়ান্ত সুখের আবাসস্থল নয়। চূড়ান্ত সুখের আবাসস্থলটি আপনাদের সামনে অপেক্ষমাণ।
আর সেটিই হলো আখিরাত। এখন, এটিকে এক নম্বরে রাখা উচিত নয়; কেন? কারণ, যদি এটিকে এক নম্বরে রাখেন, তখন আপনি বলবেন, “আমি অন্য কিছুই করব না”।
না, পরিস্থিতিকে ভালো করার জন্য আপনাকে অবশ্যই সম্পূর্ণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কুরআনের কোনো গল্প, কিংবা সিরাতের কোনো ঘটনাই এমন ভাগ্যনির্ভর নয় যে, “বাদ দাও, যা ঘটার তা ঘটবেই”। না। এমনকি ফেরাউনের বিশাল সেনাবাহিনী যখন আপনার পেছনে, আর সামনে বিশাল লোহিত সাগর, তখনও হাল ছেড়ে দিবেন না, আপনাকে কিছু একটা করতে হবে। হোক সেটা একটা লাঠি উঁচিয়ে ধরা এবং আঘাত করে অলৌকিক কোনো ঘটনার অপেক্ষা করা, তবুও প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এটাই হলো প্রকৃত বাস্তবতা। এমনকি মরিয়ম (‘আলাইহাস সালাম)-এর মতো আপনি যখন সম্পূর্ণ একা থাকবেন, কোনো খাবার নেই, কোনো পানি নেই, তবুও আপনাকে গাছটি নাড়াতে হবে, প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এরপরই আল্লাহর রহমতে কিছু ঘটতে পারে। কখনোই হাল ছাড়বেন না।
তবে, এটাও মনে রাখবেন যে এই দুনিয়া চূড়ান্ত সুখের স্থান নয়। আমরা যে কষ্ট অনুভব করি, তা হয়তো কিছুটা কমানো যেতে পারে, কিন্তু কষ্টকে এই পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণরূপে তাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব না। আর এই কারণেই আমরা পরবর্তী জগতের প্রত্যাশা করি। আল্লাহ সেই পরবর্তী জগতটিকে চমৎকার নামে আখ্যায়িত করেছেন। [لَهُمْ دَارُ السَّلَامِ عِنْدَ رَبِّهِمْ] - (লাহুম দারুস সালামি ঈনদা রব্বিহিম)। [وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَىٰ دَارِ السَّلَامِ] - (ওয়াল্লাহু ইয়াদ’উ ইলা দারিস সালাম) - আল্লাহ তোমাদেরকে দারুস সালামের দিকে ডাকছেন। জান্নাতকে কেন ‘দারুস সালাম’ বলা হয়, জানেন? আক্ষরিকভাবেই ‘দারুস সালাম’ অর্থ, এমন আবাস যেখানে কোনো কষ্ট নেই, যেখানে কোনো দুশ্চিন্তা নেই, যা হলো চূড়ান্ত প্রশান্তির আবাসস্থল।
এই পৃথিবীতে চূড়ান্ত দারুস সালাম নেই। প্রকৃত দারুস সালাম হলো আখিরাত। একটি কথা বুঝুন, আপনার কাছে কিছু থাকুক বা না থাকুক, এই দুনিয়া কখনোই আপনাকে পরিপূর্ণ শান্তি এনে দিবে না। এটা বুঝুন। কখনোই না। আল্লাহর শপথ, এই পৃথিবীতে কারো মধ্যেই পরিপূর্ণ মানসিক প্রশান্তি নেই। সমস্যা আছেই।
আপনার কাছে টাকা থাকুক, বা না থাকুক; আপনার সন্তান থাকুক, বা না থাকুক; আপনার সুস্থ দাম্পত্য জীবন থাকুক, বা না থাকুক, তাতে কিছুই যায় আসে না। আপনার কাছে যা কিছুই থাকুক, সেখানে সমস্যা থাকবে এবং অপূর্ণতাও থাকবে। আপনার কাছে যা কিছু আছে, এমনকি সেই জিনিসগুলোও নিখুঁত নয়। এটাই হলো প্রকৃত বাস্তবতা। এই পৃথিবীতে কখনোই চূড়ান্ত সুখ লাভ করতে পারবেন না। আমাদের লক্ষ্য হলোঃ এই দুনিয়ায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করা আর আখিরাতে গিয়ে সেই সুখ পরিপূর্ণরূপে লাভ করা। হ্যাঁ। এই পৃথিবী কখনোই পুরোপুরি নিখুঁত হবে না। তাই উপলব্ধি করুন, এই দুনিয়া যত কঠিনই হোক না কেন, এটি অস্থায়ী। কয়েকটা দিন। আর তারপর আপনি চিরকাল, অনন্তকালের জন্য ফিরে যাবেন সেই দা-রুস সা-আদা, দা-রুস সালাম, দা-রুল আখিরার দিকে [دَارُ السَّعَادَةْ ، دَارُ السَّلَامْ ، دَارُ الْآخِرَةْ]
আমাদের গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ আছে যে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) একবার গভীর শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর মনের ভেতরে কিছু একটা চলছিল। আমরা জানি না বিষয়টা কী ছিল। হয়তো এটি ছিল উম্মাহর সাথে সম্পর্কিত কোনো বিষয়, কিংবা হয়তো এটি ছিল ব্যক্তিগত কোনো বিষয়। আমরা জানি না। আর মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবীগণের একজন, আবু উবাইদা ‘আমের ইবনুল জাররাহ, তিনি বেশ কিছু সময় ধরে বিষয়টা লক্ষ করলেন। তাই একদিন তিনি উমরকে সোজাসুজি বলে ফেললেন, “হে আমিরুল মুমিনীন, আপনার কী হয়েছে, যে সবসময় আপনার মাঝে এতোটা বিষণ্ণতা এবং হতাশা দেখতে পাচ্ছি? আপনি কি এমন সংবাদ পেয়েছেন যে আল্লাহ আপনার জান্নাত কেড়ে নিয়েছেন”? তিনি বললেন, না। “আপনি কি এমন সংবাদ পেয়েছেন যে আপনি জাহান্নামে যাচ্ছেন”? তিনি বললেন, না।
“তাহলে কেন এতো বেশী দুশ্চিন্তায় ভুগছেন? এই দুনিয়ায় যা-ই ঘটুক হোক না কেন, এটা ক্ষণস্থায়ী”। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি আখিরাত পাবেন, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার মনে আখিরাতের আশা বেঁচে থাকবে, যাই ঘটুক না কেন, এসব কেবল কয়েকদিনের ব্যাপার মাত্র, আর তারপর এটা শেষ; আমাদেরকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কাছে ফিরে যেতে হবে। এই পাঁচ নাম্বার পয়েন্টটি একদম সবার শেষে আসবে। কারণ, শুরুতেই আমরা হাল ছেড়ে দিতে পারি না। না। এটি একদম শেষে একটি সান্ত্বনা হিসেবে আসবে, একটি বাস্তবতা হিসেবে আসবে যে, এই পৃথিবী কখনোই চূড়ান্ত প্রশান্তি দিতে পারবে না।
আমার প্রিয় ভাই ও বোনেরা, এই পাঁচটি পয়েন্ট হলো এমন কিছু উপায়, যার সাহায্যে আমরা মানসিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণা কাটিয়ে উঠতে পারি। আর সতর্ক থাকবেন, যদি কখনো নিজেকে সেই বিষণ্ণতার অন্ধকার সাগরে তলিয়ে যেতে দেখেন। আপনি যদি দীর্ঘ সময় ধরে নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করতে থাকেন, যদি কোনো কিছু করতে গিয়ে মাঝপথেই বন্ধ করে দেন, যদি কখনো এই দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার অথবা নিজের ক্ষতি করার কোনো অন্ধকার চিন্তা আপনার মাথায় আসে, আস্তাগফিরুল্লাহ — এগুলোই হলো লক্ষণ যে আপনার পেশাদার কারো সহায়তা প্রয়োজন। এগুলোই হলো লক্ষণ যে আপনার অন্য মানুষের স্মরণাপন্ন হয়ে তাদের কাছ থেকে সহায়তা নেয়া উচিত। আর এই কাজে কখনোই লজ্জিত বা বিব্রত বোধ করবেন না। আমাদের ধর্ম বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু মাঝে মাঝে আমাদেরকে অবশ্যই পেশাদার কারো সহায়তা গ্রহণ করতে হবে।
যে পদক্ষেপই নেয়া হোক, জেনে রাখুন যে, অধিক ধর্ম পালন, অধিক পরিমাণ ঈমান, অধিক পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা এবং অধিক বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গ সবসময়ই আপনার পক্ষে কাজ করবে। আল্লাহর দিকে ফিরে আসুন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন যাতে বিষয়গুলো সহজ হয়ে যায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা যেন কুরআনের রহমত দ্বারা আমাদের সকলকে সিক্ত করেন।
আর তিনি যেন আমাদেরকে এমন মানুষদের অন্তর্ভুক্ত করেন যারা তাঁর আয়াতগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করে এবং সারাজীবন ধরে তাঁর আদেশ-নিষেধগুলো মেনে চলে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আপনারাও ক্ষমা চান। কারণ তিনি আল-গফুর, আর-রহমান।
আলহামদু লিল্লাহ। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি এক এবং অদ্বিতীয়। আমরা কেবল তাঁরই উপাসনা করি এবং তাঁরই রহমত কামনা করি। তিনি সকল অত্যাচারিতের সহায় এবং তিনিই সকল দুর্বলের প্রার্থনা শ্রবণকারী।
পরবর্তী কথা হলো, চমৎকার একটি দোয়া রয়েছে যা আমি চাই আপনারা সবাই মুখস্ত করে ফেলুন, মানসিক সমস্যা এবং বিষণ্ণতার এই বাস্তবতায় কিছুটা উপশম প্রদান করার জন্য। এই দোয়াটি আসলে একটি রত্ন। সমস্ত হাদিসই রত্ন এবং প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ। এই দোয়াটি, এটি একটি নববী প্রজ্ঞা। আমি মনে করি, যার গভীরতা আমরা কেবল আধুনিক সময়ে এসে পুরোপুরি বুঝতে শুরু করেছি। এটি একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দোয়া যা সম্ভাব্য বিষণ্ণতার তথা এই বাস্তবতার জন্য একটি উপশম হিসেবে কাজ করবে। রসূল (স) আমাদেরকে এই দোয়াটি শিখিয়েছেন এবং তিনি এই যিকিরটি উচ্চারণ করতে বলেছেন — [اَللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الهَمِّ وَالحُزْنِ، وَالعَجْزِ وَالكَسَلِ] - (আল্লাহুম্মা ইন্নি আ’উযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল-হুযন, ওয়াল ‘আজযি ওয়াল কাসাল)। চারটি বিষয়।
ও আল্লাহ, আমি [اَلْهَمْ] - (আল-হাম) থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি। [اَلْهَمْ] অর্থ উদ্বেগ। এটি হলো ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা। এটি হলো পরিণতি নিয়ে চিন্তা — আগামীকাল কী ঘটতে যাচ্ছে। “আগামীকালের ঘটিতব্য উদ্বেগ থেকে আমি আপনার কাছেই আশ্রয় চাই”। [وَالحُزْنِ], হুযুন হলো অতীতের জন্য আফসোস এবং দুঃখবোধ। হুযুন — “আহ, সেই সুযোগটি হাতছাড়া হয়ে গেল! খারাপ কিছু ঘটে গেছে, আমি হয়তো এটা করতে পারতাম”! ইত্যাদি ইত্যাদি; এগুলো অতীতকালের আফসোস। হাম — আগামীকাল, হুযুন — গতকাল। [وَالعَجْزِ], ‘আজয অর্থ, অক্ষমতা, কোনো কাজ না করা। আর [كَسَلْ] অর্থ হাল ছেড়ে দেয়া এবং অলসতা।
যদি এই চারটি বাস্তবতার দিকে লক্ষ করেন, মূলত এই চারটি বাস্তবতাই মানুষকে বিষণ্ণতার দিকে ঠেলে দেয় — যদি আমরা এগুলোকে বাড়তে সুযোগ দিই, যদি আমরা এগুলোকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলার সুযোগ দিই। এই চারটি আবেগকে একসাথে যুক্ত করে রসূল (স) যে গভীর প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন, তা নিয়ে অনেক কিছুই বলা যেতে পারে। প্রথমত, আগামীকালের জন্য উদ্বেগ। “আমার কী হবে? আমার সন্তানরা কীভাবে বেঁচে থাকবে? আমি কাজ পাবো কীভাবে”? এটাই হলো হাম।
ও আল্লাহ, আমি অতিরিক্ত উদ্বেগের এই খারাপ পরিণতি থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। দ্বিতীয়ত হলো, হুযুন। “গতকাল আমি কী করেছিলাম? গত বছর আমি কী করেছিলাম? কেন আমি এই কাজটা করেছিলাম”? এই অতিরিক্ত চিন্তাই সমস্যার কারণ। এতে লাভটা কী? এটা অতীত। আপনি যেমন ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না, একইভাবে অতীতকেও পাল্টাতে পারবেন না। কিছুটা চিন্তা হতেই পারে, মানুষ মাত্রই কিছুটা চিন্তা থাকবে। কিন্তু সেটা যখন আপনাকে পরিবর্তন করে ফেলে, সেটা যখন আপনাকে গ্রাস করে ফেলে তখনই সমস্যা — [اَللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ]। সেরকম পরিস্থিতি আমরা চাই না।
তৃতীয়ত, [اَلْعَجْز], আল-‘আজয হলো এমন পর্যায় যখন আবেগটি বিশ্বাসে পরিণত হয়। “আমি কিছুই করতে পারি না, আমার কোনো কাজেরই মূল্য নেই, আমার অস্তিত্বটাই অপ্রাসঙ্গিক”। আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন — অর্জিত অসহায়ত্ব। আপনি তীব্র অসহায়ত্ব অনুভব করেন, নিজেকে মূল্যহীন মনে করার এক অদ্ভুত অনুভূতি। “আমার বেঁচে থাকার কী অর্থ আছে? আমার পৃথিবীতে থাকার কী প্রয়োজন”? আবারো বলছি, ক্ষণস্থায়ী চিন্তা হিসাবে আসাটা তেমন সমস্যাজনক না, এমনকি মরিয়ম (‘আলাইহাস সালাম)-এর মনেও সেরকম ক্ষণস্থায়ী চিন্তা এসেছিল। তবে যদি দেখেন যে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ধরে এমনটাই ভাবছেন, তবে এটি একটি সমস্যা। এটি একটি বড় বিপদ সংকেত।
যদি এরকম চিন্তা মাথায় চলে আসে — “বেঁচে থাকার চাইতে আমার অস্তিত্ব না থাকাই বরং ভালো”, আর আপনি সেই চিন্তাগুলোকে মাথায় পুষে রাখতে শুরু করেন… আমি আগেই বলেছি, মাঝে মাঝে এরকম ক্ষণস্থায়ী চিন্তা মাথায় আসা, মানুষ হিসেবে এটা আসতেই পারে। কিন্তু সবসময় মনে রাখবেন, অস্তিত্বহীনতার চেয়ে অস্তিত্ব টিকে থাকাটা বেশি কল্যাণকর। পৃথিবীতে থেকে আল্লাহর যিকির করা, ইবাদত করা, পৃথিবীতে না থাকার চেয়ে লাখো-কোটি গুণে ভালো। আর যদি মনে করেন যে আপনার বেঁচে থাকাটা উপকারী নয় এবং মনে অন্ধকার চিন্তা আসতে থাকে, তাহলে এটি একটি বড় ধরনের বিপদ সংকেত। আমি চাই আপনি অবিলম্বে সহায়তা গ্রহণ করুন। সুতরাং [اَلْعَجْز] হলো এই বিশ্বাস যে, “চেষ্টা করাটা অর্থহীন। কোনো কিছু করার কোনো মানে হয় না।”
এরপর রয়েছে [اَلْكَسَلْ], আল-কাসাল হলো আচরণগত মনস্তত্ত্ব। “আমি কোনো কাজই করতে চাই না”। তো, ‘আজয হলো মনের একটা বিশেষ অবস্থা। আর কাসাল হলো শারিরীক অবস্থা। কাসাল হলো — চরম অলসতা। কাসাল হলো — উদ্যমের অভাব। কাসাল হলো — জীবন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। আপনি আক্ষরিক অর্থেই হাল ছেড়ে দেন, দরজা বন্ধ করে রাখেন, বসে থেকে কেবল টিভি দেখেন, ফেইসবুকে স্ক্রোল করতে থাকেন। এটাই কাসাল। আর কাসাল তৈরী হয় ‘আজয-এর কারণে। আজয হলো একটি মানসিক অবস্থা এবং এর পরেই কাসাল-এর সূচনা ঘটে। এটি সাধারণ অলসতার চেয়েও খারাপ। এটি হলো ইচ্ছাকৃত, অর্জিত অলসতা। এই পর্যায়ে মানুষ তার অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টাই করে না। এই চারটি বাস্তবতা, [اَللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الهَمِّ وَالحُزْنِ، وَالعَجْزِ وَالكَسَلِ]। আমরা আল্লাহর কাছে এগুলো থেকে দূরে থাকার প্রার্থনা করি, কারণ এই বিষয়গুলোই বিষণ্ণতার মূল কারণ।
সর্বশেষ যে পয়েন্টটি বলতে চাই প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আমাদের আলোচনার সময় অত্যন্ত সীমিত, যদিও অনেক কিছুই বলা যেতে পারে। সীরাত থেকে আমরা শিখতে পারি, সীরাত থেকে আমরা শিখতে পারি অন্যতম একটি ইসলামী শিষ্টাচার, যা আমি মনে করি দুর্ভাগ্যবশত আমরা ত্যাগ করেছি,
আর তা হলো কারো খোঁজ-খবর নেয়া যখন সে মানসিক চাপ বা কষ্টে থাকে এবং তার কষ্টের বোঝা নিজের কাঁধে ভাগ করে নেয়া। এটাকে বলা হয় [تَفَقُّدِ الْأَحْوَالْ] - (তাফাক্কুদিল আহওয়াল)। রসূল (স) তাঁর চারপাশের মানুষদের পর্যবেক্ষণ করতেন। তিনি খেয়াল করতেন কেউ অনুপস্থিত আছে কিনা। তিনি জিজ্ঞেস করতেন, “আবু হুরায়রা কোথায়? অমুক কোথায়? তাকে তো দেখতে পাচ্ছি না। সেই বয়স্ক নারীটি কোথায় যিনি মসজিদ পরিষ্কার করতেন”? তিনি হয়তো কাউকে কাঁদতে দেখতেন। তিনি কারো চোখের অশ্রু লক্ষ করতেন এবং নিজে গিয়ে তাদেরকে সান্ত্বনা দিতেন।
প্রায়শই আমাদের উদ্বেগগুলো আমাদেরকে গ্রাস করে ফেলে, আর আমরা অন্য কারো স্মরণাপন্ন হই না। এটা একটা ভুল কাজ। তবে বিপরীত দিক থেকে এটা আমাদেরও একটা ভুল। আমরাও আমাদের বন্ধুদের খোঁজ নিতে যাই না। এটি একটি দ্বিমুখী রাস্তার মতো। নিজে কষ্টে পড়লে আপনার উচিত পরিবার এবং প্রিয়জনের স্মরণাপন্ন হওয়া। কিন্তু আপনিই যদি কারো পরিবার এবং প্রিয়জন হয়ে থাকেন, তবে আপনারও উচিত তাদের খোঁজ-খবর নেয়া। যদি জানেন যে তারা কষ্টে আছে, যদি বুঝতে পারেন যে তারা মানসিক চাপে আছে, সীরাত আমাদেরকে শেখায়, তাদের সাথে সাক্ষাত করুন। সাক্ষাত করে বলুন, “আসলে কী ঘটছে? কীভাবে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি”?
রসূল (স) বলেছেন, আর এর মাধ্যমেই আজকের আলোচনা শেষ করছি, সর্বোত্তম যে সদকাটি আপনি প্রদান করতে পারেন, তা হলো কোনো ভাইয়ের ওপর থেকে মানসিক চাপ দূর করা অথবা তাকে আনন্দিত করা। এটাই হলো সর্বোত্তম সদকা। কেউ মানসিক চাপে আছে, কেউ কষ্টে আছে, তা দূর করে দিন। সাহায্য করুন; সেই ভাইকে সহায়তা করুন। তার কিছু টাকার প্রয়োজন, কোনো সাহায্য প্রয়োজন, যানবাহন প্রয়োজন। সর্বোত্তম সদকা হলো, সে যেই সমস্যায় আছে তা দূর করে দেয়া। অথবা [إِدْخَالُ السُّرُورْ] - (ইদখালুস সুরুর) - তাকে আনন্দিত করা। তাকে মনোরম কোনো কথা বলুন। আশাব্যঞ্জক কোনো দোয়া শিখিয়ে দিন। কিছু একটা করুন যা তার বিষণ্ণ অবস্থাকে বদলে দেবে।
আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যাদের কষ্টগুলো নিজেদের হৃদয়ে বন্দী হয়ে আছে। এমনকি আমাদের জীবনসঙ্গী, এমনকি আমাদের সন্তান, এমনকি আমাদের ঘনিষ্ঠ পরিবার এবং বন্ধুরাও সে বিষয়ে অবগত না। আর কখনো কখনো সেই কষ্ট জমাট বাধতে শুরু করে। কখনো কখনো এটি আমাদেরকে এমন অন্ধকার জায়গায় নিয়ে যায় যা মোটেও ভালো নয়।
যদি আপনি কোনো বন্ধু বা আত্মীয়কে দেখেন, যদি কোনো প্রিয় মানুষকে লক্ষ করেন যে তারা নিজেদেরকে গুটিয়ে নিয়েছে, তারা কোনো কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তবে সেই সর্বোত্তম মুসলিম হয়ে উঠুন যেরকম মুসলিম রসূল (স) আপনাকে হতে বলেছেন। কাছে যান এবং দরজায় কড়া নাড়ুন। কাছে যান এবং শুধুমাত্র সঙ্গ প্রদান করুন। এটুকুই যথেষ্ট। যদি তারা তাদের ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলতে না চায়, সেটাও ঠিক আছে। আপনার উপস্থিতি, মুচকি হাসি, ছোট একটি উপহার হয়তো অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে। হয়তো তাদের সম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিকেই বদলে দিতে পারে। দয়াদ্রতার ক্ষুদ্রতম কাজটিও হয়তো তাদের হৃদয়ের সেই বন্ধ দরজা খুলে দিতে পারে।
তাই আমাদের সমাজসমূহে, আমাদের মসজিদসমূহে, আমাদের জনপদসমূহে, আমরা একে অপরের খোঁজখবর রাখব। একে অপরের খেয়াল রাখব। একে অপরের খোঁজ নিব। আর যখন সাহায্য করার মতো কোনো সুযোগ থাকে, যখন আপনি জানেন কেউ মানসিক কষ্টে আছে, আপনার কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দাম্পত্য জীবন তিক্ততার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বা এমন কিছু, সুন্নাহ আমাদের শেখায়, আপনি জিজ্ঞেস করুন — “তোমার কোনো সহায়তা প্রয়োজন? আমি সবসময়ই তোমার পাশে আছি”। কেবল জিজ্ঞেস করুন। “তোমার কি কথা বলার জন্য কাউকে প্রয়োজন? আমি সবসময় তোমার পাশে আছি”। এই সামান্য প্রচেষ্টা হয়তো একটি জীবন বদলে দিতে পারে। এটাই হলো আমাদের ধর্মের শিক্ষা।
রসূল (স)-এর একটি উক্তি সকলকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমি শেষ করছি, যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “মানবজাতির মধ্যে সর্বোত্তম মানুষ কে”? তিনি বলেছিলেন, মানবজাতির মধ্যে সর্বোত্তম মানুষ হলো তারা, যারা মানবজাতির সবচেয়ে বেশি উপকারে আসে। আসুন আমরা তাঁদের অন্তর্ভুক্ত হই যারা মানবজাতির সবচেয়ে বেশি উপকারে আসে।
—ড. ইয়াসির কাদি
ليست هناك تعليقات:
إرسال تعليق