জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটাকে সে উপেক্ষা করেছিল—আর সেটাই ছিল তার অপরাধ
----------------- * ------------------- * -------------------
লোকটা আল্লাহকে অস্বীকার করেনি। কোনো তর্কও করেনি। কোরআনের বিরুদ্ধে একটা কথাও বলেনি। তাহলে তার দোষটা কী?
কোরআন নিজেই দৃশ্যটা এঁকে দিয়েছে। মন দিয়ে পড়ুন:
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذُكِّرَ بِآيَاتِ رَبِّهِ ثُمَّ أَعْرَضَ عَنْهَا ۚ إِنَّا مِنَ الْمُجْرِمِينَ مُنْتَقِمُونَ
"তার চেয়ে বড় জালিম আর কে, যাকে তার রবের আয়াতসমূহ স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলো, তারপর সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো? নিশ্চয়ই আমি অপরাধীদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণকারী।" (সূরা সাজদাহ: ২২)
লক্ষ্য করুন। এই মানুষটা প্রত্যাখ্যান করেনি। যুক্তি খণ্ডন করেনি। সে শুধু পিঠ ফিরিয়ে হেঁটে চলে গেছে। আর আল্লাহ তাকে কী বলছেন? মুজরিম—অপরাধী।
অহংকারী নয়। অপরাধী।
এই পার্থক্যটা বুঝতে পারলে বুকটা কেঁপে উঠবে। কারণ আমরা ভাবি, জাহান্নামের হুঁশিয়ারি তো তাদের জন্য, যারা সত্য জেনেও ঔদ্ধত্যের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেছে—ফেরাউনের মতো, ইবলিসের মতো। কিন্তু এখানে আল্লাহ এমন একজনের কথা বলছেন, যে কিছুই করেনি। আর "কিছুই না করা"টাই তার অপরাধ। এটা অপরাধতুল্য অবহেলা।
ভেবে দেখুন, এই শ্রেণিটা কারা। প্রতিটি মানুষের জীবনে এমন মুহূর্ত আসে, যখন ভেতর থেকে প্রশ্নগুলো উঁকি দেয়—এই সবকিছুর মানে কী? আমি এখানে কেন? মৃত্যুর পর কী হবে? ঊর্ধ্বে কি কোনো মহাশক্তি আছে?
তখন দুটো ঘটনার একটা ঘটে। কেউ কেউ সত্যিই থামে, ভাবে, খোঁজে, পড়ে, জিজ্ঞেস করে। আর বাকিরা? তারা বলে—যাক গে, জীবন তো একটাই। আরেকটা সিনেমা দেখে আসি। আরেকটা ডেটে ঘুরে আসি। প্রশ্নটা বড্ড কাঁটাযুক্ত, বড্ড অস্বস্তিকর। এটা নিয়ে ভাবলে জীবনটা কঠিন হয়ে যায়। তাই থাক।
আর এভাবেই টালবাহানা করতে করতে কেটে যায় গোটা একটা জীবন। শরীরের সুখ দিয়ে তারা নিজেদের বুদ্ধিকে অবশ করে রাখে। সততার সাথে স্বীকার করতে হয়—মানবজাতির এক বিরাট অংশ ঠিক এই শ্রেণিরই মানুষ।
কেউ প্রশ্ন করতে পারেন—এতে অহংকারের কী আছে? সে তো কারো সাথে দ্বন্দ্বে যায়নি!
একটু দাঁড়ান। আপনার স্রষ্টা আপনাকে চোখ দিলেন, কান দিলেন, ভাবার জন্য একটা মন দিলেন। আসমান-জমিন জুড়ে ছড়িয়ে দিলেন তাঁর অগণিত নিদর্শন। আর আপনি সেগুলোর দিকে ফিরেও তাকালেন না—এই যে জিজ্ঞেস করতেও রাজি না হওয়া, খোঁজ নিতেও এত অনীহা—এটাও এক ধরনের অহংকারই। বুদ্ধিবৃত্তিক অলসতাও অহংকারের আরেক চেহারা।
আর এই উপেক্ষার পরিণতি কী? আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ
"আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন হবে সংকুচিত, দুর্বিষহ; আর কিয়ামতের দিন আমি তাকে ওঠাবো অন্ধ অবস্থায়।" (সূরা ত্বহা: ১২৪)
সেদিন সে বলবে, "হে আমার রব, আমাকে অন্ধ করে কেন ওঠালেন? আমি তো দৃষ্টিসম্পন্ন ছিলাম!" উত্তর আসবে—ঠিক এভাবেই তোমার কাছে আমার নিদর্শনগুলো এসেছিল, আর তুমি সেগুলোর দিকে ফিরেও তাকাওনি।
কী নিখুঁত প্রতিদান, ভেবে দেখুন। দুনিয়াতে চোখ থাকতেও সে দেখেনি। তাই আখিরাতে তার চোখই থাকবে না। কোরআন এই মানুষদের চিত্র এঁকেছে আরো ভয়ংকর ভাষায়—তাদের অন্তর আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না; চোখ আছে, তা দিয়ে দেখে না; কান আছে, তা দিয়ে শোনে না। তারা চতুষ্পদ পশুর মতো; বরং তার চেয়েও পথভ্রষ্ট। (সূরা আরাফ: ১৭৯)
পশু কেন? কারণ পশুর তো ভাবার ক্ষমতাই নেই। আর এই মানুষটাকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল—সে ব্যবহারই করেনি।
আর সবশেষে সেই দৃশ্য, যা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। জাহান্নামের অধিবাসীরা সেদিন চিৎকার করে ফরিয়াদ করবে। জবাবে আল্লাহ তাদের মাত্র দুটো প্রশ্ন করবেন:
أَوَلَمْ نُعَمِّرْكُمْ مَا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَنْ تَذَكَّرَ وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ
"আমি কি তোমাদের এতটা আয়ু দিইনি, যাতে কেউ উপদেশ নিতে চাইলে নিতে পারতো? আর তোমাদের কাছে কি সতর্ককারী আসেনি?" (সূরা ফাতির: ৩৭)
দুটো মাত্র প্রশ্ন। এক—তোমাকে সময় দেওয়া হয়েছিল। যথেষ্ট সময়। এত বছরের একটা জীবন—সত্যিই চাইলে তুমি কোনো না কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারতে। দুই—সতর্ককারীও এসেছিল।
অর্থাৎ কিয়ামতের দিন অজুহাতের দুটো দরজাই বন্ধ। "আমি জানতাম না" বলার সুযোগ নেই, কারণ জানার সময় ছিল। "কেউ বলেনি" বলার সুযোগ নেই, কারণ বলার মানুষ এসেছিল।
আজ পৃথিবী জুড়ে বহু মানুষ নিজে নিজেই ইসলাম খুঁজে নিচ্ছে। কেউ তাদের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়েনি। তারা নিজেরাই খুঁজেছে, পড়েছে, লেকচার শুনেছে—তারপর মসজিদে এসে শাহাদা পড়ছে। কেন? কারণ তাদের ফিতরাহ সত্যের জন্য ব্যাকুল ছিল, আর তারা সেই ডাকে সাড়া দিয়েছে। সত্য খোঁজার রাস্তাটা দুই দিকের—আমাদের উচিত পৌঁছে দেওয়া, আর তাদেরও উচিত খোঁজ করা।
শেষ একটা কথা, নিজেদের জন্য। আমরা যারা ঈমান পেয়েছি, এই আয়াতগুলো কি আমাদের জন্যও একটা আয়না নয়? আল্লাহর নিদর্শন তো আজও আমাদের চারপাশে ছড়ানো। প্রতিদিন কতবার আমরা সেগুলোর পাশ দিয়ে "হেঁটে চলে যাই"—ফিরেও তাকাই না?
হে আল্লাহ, আমাদের সেই অন্তর দান করুন যা ভাবে, সেই চোখ দান করুন যা দেখে, সেই কান দান করুন যা শোনে। গাফেলদের দলে আমাদের লিখবেন না। আমিন।
