الثلاثاء، 6 أكتوبر 2026

অসুস্থতা: দুনিয়াতেই গুনাহ মোচনের উপহার

 


অসুস্থতা: দুনিয়াতেই গুনাহ মোচনের উপহার
রসুল (স) আমাদের জানিয়েছেন—অসুস্থতা গুনাহ মোচনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যমগুলোর একটি; আখিরাতের আগেই ক্ষমা লাভের এক অনন্য সুযোগ। বিষয়টা যেন এমন—এই দুনিয়ায় আমরা অসুস্থ হই, যাতে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে নিষ্পাপ হয়ে দাঁড়াতে পারি। হয়তো একটি মাত্র রোগ, একটি মাত্র অসুস্থতাই আমাদের সব গুনাহ ধুয়ে-মুছে দেবে।
প্রসিদ্ধ সাহাবিয়্যা উম্মে সায়িব (রা) একবার অসুস্থ হলে রসুল (স) তাঁকে দেখতে গেলেন। তিনি তখন জ্বরে কাঁপছিলেন। রসুল (স) জিজ্ঞেস করলেন, "কেমন আছ তুমি?" তিনি বললেন, "আমার জ্বর হয়েছে—এর উপর আল্লাহর অভিশাপ!"
রসুল (স) বললেন, "লা তাসুব্বিল হুম্মা (لَا تَسُبِّي الْحُمَّى)—জ্বরকে অভিশাপ দিয়ো না। কারণ এটি গুনাহ মোচন করে; তোমার ভেতর থেকে গুনাহ বের করে আনে, যেভাবে আগুনের চুল্লি লোহার খাদ দূর করে তাকে পরিশুদ্ধ করে।"
চুল্লি উত্তপ্ত—কেউই সেখানে থাকতে চায় না। কিন্তু ধাতুর খাদ দূর করে খাঁটি সোনা পেতে হলে তাকে চুল্লির আগুনে পোড়াতেই হয়। চুল্লির ভেতর দিয়ে যাওয়ার পরই তা শতভাগ নিখাদ হয়ে বেরিয়ে আসে। রসুল (স) জ্বরের তুলনা দিলেন ঠিক এই চুল্লির সঙ্গে।
জ্বর কষ্টকর বটে, কিন্তু এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা নয়—ক্যান্সারের মতো এর চেয়েও কঠিন রোগ আছে। আর জ্বর তো প্রতিটি মানুষেরই হয়। তাই আল্লাহ যখন আমাদের জ্বর বা কোনো অসুস্থতা দিয়ে পরীক্ষা করেন, তখন মনে মনে ভাবুন—ইনশা আল্লাহ, এই চুল্লির শেষে আমার ইমান হবে ২৪ ক্যারেটের খাঁটি ইমান। আল্লাহর প্রতি হুসনুয যন রাখুন, সুধারণা পোষণ করুন—এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ আমার পাপগুলো মোচন করছেন; আর আমার গুনাহ তো কম নয়! আল্লাহ এই দুনিয়াতেই তা মুছে দিচ্ছেন।
আরেকটি হাদিসে পাই—রসুল (স) এক অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গিয়ে বললেন, "তোমার জন্য সুসংবাদ রয়েছে! আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেছেন, এই জ্বর জাহান্নামের এক ধরনের শাস্তি, যা ইমানদারকে এই দুনিয়াতেই দেওয়া হয়, যেন আখিরাতে তাকে জাহান্নামের মুখোমুখি হতে না হয়।" (মুসনাদে আহমাদ)
কী চমৎকার একটি হাদিস! জ্বর যেন এই দুনিয়ার জাহান্নাম। আল্লাহ তাঁর ইমানদার বান্দাদের পরীক্ষা করেন, কারণ তিনি চান না তারা আখিরাতের জাহান্নামের মুখোমুখি হোক।
অবশ্য এই 'দুনিয়ার জাহান্নাম'ও সহজ নয়। ১০২, ১০৩, ১০৪ ডিগ্রি জ্বর কারোই ভালো লাগে না; এটা ভীষণ কষ্টকর। কিন্তু দিন শেষে তা সাময়িক এবং সহনীয়। একবার সেরে গেলেই আমরা বলি—আলহামদুলিল্লাহ, এখন সুস্থ আছি। আর মহান আল্লাহ তাদেরই পরীক্ষা করেন, যাদের তিনি ভালোবাসেন। কিছু মানুষের পাপ তিনি এই দুনিয়াতেই ক্ষমা করে দিতে চান—তাই প্রেরণ করেন এই 'দুনিয়ার জাহান্নাম', যেন বান্দা রক্ষা পায় আখিরাতের জাহান্নাম থেকে।
এ কারণেই রোগী জ্বরে কাঁপতে থাকা সত্ত্বেও রসুল (স) তাকে বললেন, "আশার দিকটা লক্ষ কর—এর দ্বারা তোমার পাপ মোচন হচ্ছে। ইনশা আল্লাহ, এই একটি জ্বরের কারণেই জাহান্নামের 'আযাবের স্বাদ তোমাকে পেতে হবে না।"
সুবহানাল্লাহ! আমাদের আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক এমনই—আমরা মন্দকে ভালোতে রূপান্তরিত করি, উজ্জ্বল দিকটাই দেখি। রসুল (স) আমাদের এই শিক্ষাই দিয়ে গেছেন।
সাহাবিগণও এই আশাবাদকে আত্মস্থ করেছিলেন। প্রসিদ্ধ সাহাবি সালমান আল-ফারেসি (রা) এক রোগীকে দেখতে গিয়ে বললেন, "আবশির (أَبْشِرْ)—আনন্দিত হও, প্রফুল্ল হও! কারণ যখনই একজন ইমানদার অসুস্থ হয়, এর পেছনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার দুটি উদ্দেশ্য থাকে। প্রথমত, তার পাপ মোচন—কাফফারা (كَفَّارَة)। দ্বিতীয়ত, সেই ইমানদার যেন আত্মসমালোচনার মাধ্যমে আরও উত্তম মানুষে পরিণত হয়।"
সত্যিই তো! সুস্থ থাকা অবস্থায় দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে আমরা মাঝে মাঝে কিছুটা উদ্ধত হয়ে উঠি। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, সুস্থ-সবল দেহ আর সম্পদের প্রাচুর্য—দুনিয়ার এই চাকচিক্য যেন আমাদের মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। তারপর একটা জ্বর আসে, একটা অসুখ আসে, আর আমরা বিছানায় পড়ে বিনয়াবনত হয়ে যাই। উপলব্ধি করি—আমরা সকলেই মরণশীল; আমরা সকলেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার দাস।
সেই জ্বর আমাদের বাধ্য করে জীবনের অগ্রাধিকারগুলো পুনর্মূল্যায়ন করতে। আমরা পরিবারের ভালোবাসা নতুন চোখে দেখি—উপলব্ধি করি, জীবনসঙ্গী আর সন্তানদের জন্য আমাদের কতটা কৃতজ্ঞ থাকা উচিত; আত্মকেন্দ্রিক হয়ে তাদের উপেক্ষা করা উচিত নয়। বন্ধুদের বন্ধুত্ব লক্ষ করি, আর বুঝি—উপার্জিত অর্থ-সম্পদের চেয়েও এ এক উত্তম নিয়ামত।
অসুস্থতা যেন একটা চার্জিং স্টেশন। মাঝে মাঝে আমাদের ইমানের ব্যাটারিতে চার্জ থাকে না, অথচ দুনিয়ার কারণে শরীরে থাকে ফুল চার্জ। জীবন ভালো, ব্যবসা ভালো, চাকরিও ভালো চলছে—আর আমাদের ইমান ক্ষীণ হতে থাকে। শরীর যেন সুখেই আছে, অথচ ভেতরে ভেতরে আমরা সুখী নই। তখন সেই অসুখ আসে, আর তা আমাদের সঠিক পথে ফেরায়—বাধ্য করে জীবনের অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনা করতে, ছোট ছোট নিয়ামতের মর্ম উপলব্ধি করতে, আর শেষ সময় আসার আগেই নিজেদের শুধরে নিতে।
সালমান আল-ফারেসি (রা) আমাদের এই মহামূল্যবান প্রজ্ঞাই শিখিয়ে গেছেন—ইমানদারের অসুস্থতা শাস্তি নয়; তা পরিশুদ্ধি, আর নতুন করে জেগে ওঠার আহ্বান।
—ডক্টর ইয়াসির কাদী
قد تكون صورة ‏نص‏


ليست هناك تعليقات:

إرسال تعليق